WHAT'S NEW?
Loading...


পৃথিবীর মানুষ আজকাল যে ধরনের বিজ্ঞানচর্চায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে সেটি কিন্তু তুলনামূলকভাবে বেশ নূতন। আগে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ কিছু একটা বলতেন, অন্য সবাই তখন সেটাকেই মেনে নিতো। অ্যারিস্টটল তাঁর সময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন, তিনি বলেছিলেন ভারী জিনিস হালকা জিনিস থেকে তাড়াতাড়ি নিচে পড়ে— কেউ কোনো রকম আপত্তি না করে সেটা মেনে নিয়েছিলেন।

অ্যারিস্টটল তাঁর সময়ের খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন।

দুই হাজার বছর পর একজন বিজ্ঞানী (গ্যালেলিও গ্যালিলি) ব্যাপারটা একটু পরীক্ষা করতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন বিষয়টি সত্যি নয়, ভারী এবং হালকা জিনিস একই সাথে নিচে এসে পড়ে। বিজ্ঞানের একটা ধারণাকে যে গবেষণাগারে পরীক্ষা করে তার সত্য মিথ্যা যাচাই করে দেখা যায় সেই চিন্তাটি মোটামুটিভাবে বিজ্ঞানের জগৎটাকেই পাল্টে দিয়েছিল। এই নূতন পদ্ধতিতে বিজ্ঞানচর্চায় কৃতিত্বটা দেয়া হয় নিউটনকে (আইজ্যাক নিউটন)।

আধুনিক পদ্ধতিতে বিজ্ঞানচর্চা শুরু করেছিলেন আইজ্যাক নিউটন।

বর্ণহীন আলো যে আসলে বিভিন্ন রংয়ের আলোর সংমিশ্রণ সেটা নিউটন প্ৰথম আবিষ্কার করেছিলেন। সেই সময়ের নিয়ম অনুযায়ী এই তত্ত্বটা প্ৰকাশ করার পর সকল বিজ্ঞানীদের সেটা নিয়ে আলোচনা করার কথা ছিল, কারো কারো এর পক্ষে এবং কারো কারো এর বিপক্ষে যুক্তিতর্ক দেয়ার কথা ছিল। নিউটন এইসব আলোচনার ধারে কাছে গেলেন না, একটা প্রিজমের ভিতর দিয়ে বর্ণহীন সূর্যের আলো পাঠিয়ে সেটাকে তার ভিতরের রংগুলিতে ভাগ করে দেখালেন। শুধু তাই না, আবার সেই ভাগ হয়ে যাওয়া রংগুলোকে দ্বিতীয় একটা প্রিজমের ভেতর দিয়ে পাঠিয়ে সেটাকে আবার বর্ণহীন সূর্যের আলোতে পাল্টে দিলেন। পরীক্ষাটি এত অকাট্য যে তাঁর তত্ত্বটা নিয়ে কারো মনে এতটুকু সন্দেহ থাকার কথা নয়। সেই সময়কার বিজ্ঞানীরা কিন্তু এই ধরনের বিজ্ঞানচর্চায় অভ্যস্ত ছিলেন না এবং নিউটন যে তাঁর তত্ত্ব নিয়ে তর্কবিতর্ক করার কোনো সুযোগই দিলেন না সে জন্যে তাঁর ওপরে খুব বিরক্ত হয়েছিলেন, তাদের মনে হয়েছিল নিউটন যেন কোনোভাবে তাদের ঠকিয়ে দিয়েছেন!

নিউটনের নিজের হাতে আঁকা ছবি, একটি প্রিজম সূর্যের আলোকে সাত রংয়ে ভাগ করছে, অন্য প্রিজম সেই ভাগ করা রংগুলোকে একত্র করে আবার বর্ণহীন আলোতে পাল্টে দিচ্ছে।

সেই সময়কার বিজ্ঞানীরা ব্যাপারটাকে যত অপছন্দই করে থাকুন না কেন বর্তমান বিজ্ঞানচর্চা কিন্তু এভাবেই হয়। বিজ্ঞানীরা আমাদের চারপাশের জগৎটাকে বোঝার চেষ্টা করেন, প্রকৃতি যে নিয়মে এই জগৎটিকে পরিচালনা করে সেই নিয়মগুলোকে যতদূর সম্ভব স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। গণিতের ভাষা থেকে নিখুঁত আর স্পষ্ট ভাষা কী হতে পারে? তাই বিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রকৃতির সূত্রগুলোকে গাণিতিক কাঠামো দিয়ে ব্যাখ্যা করা। “বস্তুর ভর আসলে শক্তি” না বলে বিজ্ঞানীরা আরো নিখুঁত গাণিতিক ভাষায় বলেন, “বস্তুর ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গের গুণফল হচ্ছে শক্তি”। বিজ্ঞানের এই সূত্রগুলো খুঁজে বের করা হয় পর্যবেক্ষণ কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে। মাঝে মাঝে কেউ কেউ শুধু মাত্র চিন্তাভাবনা করে একটা সূত্র বের করে ফেলেন, অন্য বিজ্ঞানীদের তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেটার সত্য মিথ্যা খুঁজে বের করতে হয়।

পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানের কোনো রহস্য বুঝে ফেলার একটা উদাহরণ তৈরি করেছিলেন কোপার্নিকাস। যারা চন্দ্র এবং সূর্য কিংবা অন্য গ্ৰহ নক্ষত্ৰকে আকাশে উদয় এবং অস্ত হতে দেখেছে তারা ধরেই নিয়েছিল সবকিছুই পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে। নিজের চোখে সেটা দেখছেন অস্বীকার করার উপায় কী? কিন্তু কোপার্নিকাস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু লক্ষ করলেন এবং বুঝতে পারলেন আসলে ব্যাপারটি অন্যরকম— সূৰ্য রয়েছে মাঝখানে, তাকে ঘিরে ঘুরছে পৃথিবী এবং অন্য সবগুলো গ্ৰহ। প্রায় সাড়ে চারশ’ বছর আগে কোপার্নিকাস প্রথম যখন ঘোষণাটি করেছিলেন তখন সেটি তেমন সাড়া জাগাতে পারে নি। একশ’ বছর পর গ্যালেলিও যখন সেটাকে গ্রহণ করে প্রমাণ করার চেষ্টা করতে লাগলেন তখন ধর্মযাজকরা হঠাৎ করে তাঁর পিছনে লেগে গেলেন। তাদের ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে পৃথিবী সবকিছুর কেন্দ্র, সেই পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে ঘোষণা করা ধর্মগ্রন্থকে অস্বীকার করার মতো। ভ্যাটিকানের পোপেরা সে জন্যে তাকে তখন ক্ষমা করেন নি। ব্যাপারটি প্রায় কৌতুকের মতো যে গ্যালেলিওকে ভ্যাটিকান চার্চ ক্ষমা করেছে মাত্র 1992 সালে। তাদেরকে দোষ দেয়া যায় না— ধর্মের ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস, কাজেই ধর্মগ্রন্থে যা লেখা থাকে সেটাকে কেউ কখনো প্রশ্ন করে না, গভীর বিশ্বাসে গ্রহণ করে নেয়। বিজ্ঞানে বিশ্বাসের কোনো স্থান নেই। বিজ্ঞানের যে কোনো সূত্ৰকে যে-কেউ যখন খুশি প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি-তর্ক, পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে সেই সূত্রের সত্যতা তখন প্রমাণ করে দিতে হবে। কাজেই কেউ যদি বিজ্ঞান ব্যবহার করে ধৰ্মচর্চা করে কিংবা ধর্ম ব্যবহার করে বিজ্ঞানচর্চা করার চেষ্টা করে তাহলে বিজ্ঞান বা ধর্ম কারোই খুব একটা উপকার হয় না। গবেষণা করে দেখা গেছে যে, চতুরতার সাথে দুর্নীতি করা হলে আইনের সাথে কোনো ঝামেলা ছাড়াই বড় অংকের অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। এ-রকম একটি “বৈজ্ঞানিক তথ্য” উপস্থিত থাকার পরও আমরা কিন্তু সব সময়েই সবাইকে সৎভাবে বেঁচে থাকার একটি “অবৈজ্ঞানিক” উপদেশ দিই এবং নিজেরাও অবৈজ্ঞানিকভাবে সৎ থাকার চেষ্টা করি। পৃথিবীতে বিজ্ঞান একমাত্র জ্ঞান নয়, যুক্তিতর্ক, পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রমাণ করা যায় না এ-রকম অনেক বিষয় আছে, আমরা কিন্তু সেগুলোর চর্চাও করি। বিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য-দর্শন এ-রকম অনেক বিষয় আছে এবং সব মিলিয়েই সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডার এবং পৃথিবীর সভ্যতা। কাজেই সবকিছুকে বিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হবে সেটিও সত্যি নয়।

কোপার্নিকাস প্রথমে বলেছিলেন, সৌরজগতে সূর্যকে কেন্দ্র করে সব গ্রহগুলো ঘুরছে।

কোপার্নিকাস গ্রহ-নক্ষত্র এবং চন্দ্ৰ-সূৰ্যকে পর্যবেক্ষণ করে একটি বৈজ্ঞানিক সূত্রে উপস্থিত হয়েছিলেন, বিজ্ঞানীরা সব সময় এ-রকম পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করেন না। যেটা পর্যবেক্ষণ করতে চান সম্ভব হলে সেটি গবেষণাগারে তৈরি করে সেটাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে থাকেন। একসময় মনে করা হতো সমস্ত বিশ্বজগৎ, গ্রহ, নক্ষত্র সবকিছু ইথার নামক অদৃশ্য এক বস্তুতে ডুবে আছে, পানিতে যেরকম ঢেউ তৈরি করা হয় আলো সেরকম ইথারের মাঝে তৈরি করা ঢেউ। বিজ্ঞানীরা তখন একটি চুলচেড়া পরীক্ষা করতে শুরু করলেন, পরীক্ষার উদ্দেশ্য ইথারের মাঝে দিয়ে পৃথিবী কত বেগে ছুটে যাচ্ছে সেটা বের করা। মাইকেলসন (আলবার্ট এ মাইকেলসন) এবং মোরলির (এডওয়ার্ড ডাব্লিউ মোরলি) এর পরীক্ষায় দেখা গেল ইথার বলে আসলে কিছু নেই। (অনেক কবি সাহিত্যিক অবশ্যি এখনো সেই খবরটি পান নি, তারা তাদের লেখালেখিতে এখনও ইথার শব্দটি ব্যবহার করে যাচ্ছেন!) ইথারের মতো এ-রকম গুরুত্বপূর্ণ একটা ধারণা বিজ্ঞানীরা যেরকম একটা পরীক্ষা করে অস্তিত্বহীন করে দিয়েছিলেন ঠিক সেরকম আরও অনেক ধারণাকে পরীক্ষা করে সত্যও প্রমাণ করেছেন। পৃথিবীর নূতন বিজ্ঞান এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপরে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে, তাই বিজ্ঞানচর্চার একটা বড় অংশ এখন গবেষণাগারের উপর নির্ভর করে। তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক বিজ্ঞান এখন একটি আরেকটির হাত ধরে অগ্রসর হচ্ছে, একটি ছাড়া অন্যটি এগিয়ে যাবার কথা আজকাল কেউ কল্পনাও করতে পারে না।

মাইকেলসন আর মোরলি একটা পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন ইথার বলে কিছু নেই।

পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াও অবশ্যি বিজ্ঞানীরা সব সময়েই যুক্তিতর্ক ব্যবহার করে প্রকৃতির রহস্যকে বুঝতে চেষ্টা করেন। বড় বড় বিজ্ঞানীদের এক ধরনের ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয় থাকে, সেই ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয় দিয়ে তারা অনেক কিছু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন— যা হয়তো সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারেন না। মাইকেলসন এবং মোরলি একটি চুলচেড়া পরীক্ষা করে ইথার নামক বস্তুটিকে অস্তিত্বহীন করে দিয়েছিলেন, বিজ্ঞানী আইনস্টাইন সেই একই কাজ করেছিলেন সম্পূর্ণ অন্যভাবে। ইলেকট্রো ম্যাগনেটিজমের কিছু সূত্রকে সমন্বিত করার জন্যে তিনি তাঁর জগদ্বিখ্যাত আপেক্ষিক সূত্র বের করেছিলেন, পুরোপুরি চিন্তা-ভাবনা এবং যুক্তিতর্ক দিয়ে। তাঁর আপেক্ষিক সূত্র সরাসরি ইথারকে বাতিল করে দিয়েছিল এবং মোরলির পরীক্ষাটি ছিল তার প্রমাণ।

আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিক সূত্র বের করেছিলেন শুধুমাত্র চিন্তাভাবনা আর যুক্তিতর্ক দিয়ে।

কাজেই বলা যেতে পারে আমাদের আধুনিক বিজ্ঞানচর্চা এখন পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা যুক্তিতর্ক এই তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। বিজ্ঞান ব্যাপারটি আমরা সবাই সরাসরি দেখতে পাই না কিন্তু বিজ্ঞানের ব্যবহার বা প্রযুক্তি (টেকনোলজি)-কে বেশ সহজেই দেখতে পাই। এটি এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই প্ৰযুক্তির মোহ আমাদের অনেক সময় অন্ধ করে ফেলছে, আমরা অনেক সময় কোনটা বিজ্ঞান আর কোনটা প্রযুক্তি সেটা আলাদা করতে পারছি না। বিজ্ঞানের কৃতিত্বটা প্রযুক্তিকে দিচ্ছি, কিংবা প্রযুক্তির অপকীর্তির দায়ভার বহন করতে হচ্ছে বিজ্ঞানকে।

ভোগবাদী পৃথিবীতে এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিকে আলাদা করে দেখা— তা না হলে আমরা কিন্তু খুব বড় বিপদে পড়ে যেতে পারি।

===============

১. ভারী বস্তু এবং হালকা বস্তু যে একই সাথে নিচে পড়বে সেটা কোনো পরীক্ষা না করে শুধুমাত্র যুক্তিতর্ক দিয়েই বের করা সম্ভব। ধরা যাক ভারী বস্তু তাড়াতাড়ি এবং হালকা বস্তু ধীরে ধীরে নিচে পড়ে। এখন একটি ভারী বস্তুর সাথে হালকা বস্তু বেঁধে দিলে হালকা বস্তুটি ভারী বস্তুটিকে তাড়াতাড়ি পড়তে বাধা দিবে, কাজেই দুটি মিলে একটু আস্তে পড়বে। কিন্তু আমরা অন্যভাবেও দেখতে পারি ভারী এবং হালকা মিলে যে বস্তুটা হয়েছে সেটা আরো বেশি ভারী, কাজেই আরো তাড়াতাড়ি পড়া উচিত। একভাবে দেখা যাচ্ছে আস্তে পড়বে অন্যভাবে দেখা যাচ্ছে দ্রুত পড়বে। এই বিভ্রান্তি মেটানো সম্ভব যদি আমরা ধরে নিই দুটো একই গতিতে নিচে পড়বে।

২. আইনস্টাইনের বিখ্যাত সূত্র E = mc2.

(লেখাটি মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘একটুখানি বিজ্ঞান’ গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।)


মার্স হেলিকপ্টার স্কাউট

এ শতাব্দীর তিরিশের দশকেই মঙ্গলে মানব কলোনি গড়তে চায় নাসা। তার জন্য চলছে জোর প্রস্তুতি। মঙ্গলের বুকে নাসা পাঠিয়েছে ফিনিক্স, কিউরিওসিটির মতো রোভার ল্যান্ডার। এবার তারা চায় অন্য এক যান পাঠাতে। পৃথিবীতে চলে, মানুষ আনা-নেওয়ার কাজ করে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে— এমন একটি যান পাঠিয়ে মানব কলোনির দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে যেতে চায় নাসা। আর সেই যানটি হলো একটা হেলিকপ্টার। মঙ্গলের জন্য বিশেষভাবে তৈরি, তাই এর নাম মার্স হেলিকপ্টার স্কাউট (MHS)।
মঙ্গলে বায়ুমণ্ডল আছে। কিন্তু সেটার ঘনত্ব পৃথিবীর মতো এতটা নয়। কপ্টার চলে বাতাসে ভর দিয়ে। তাহলে সেখানে হেলিকপ্টার চলবে কী করে? এ জন্যই মঙ্গলের আবহাওয়ার উপযোগী করে বিশেষভাবে তৈরি করা হচ্ছে এই হেলিকপ্টার। ২০১৩ সাল থেকে চলছে এই হেলিকপ্টার তৈরি নিয়ে গবেষণা। মঙ্গলে পাঠানোর আগে এই হেলিকপ্টারের ওড়াওড়ির মহড়া চলবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলেই। বায়ুচাপ কম হলেও সেই হেলিকপ্টার পৃথিবীর কপ্টারগুলোর তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ উঁচুতে উঠতে পারবে।
মঙ্গলে কলোনি গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২০ সালে আরেকটি রোভার মহাকাশযান সেখানে পাঠাবে নাসা। সেই মহাকাশযানের সঙ্গে পাঠানো হবে মার্সকপ্টারটিকে।
মঙ্গলের হালকা বায়ুমণ্ডলের কথা মাথায় রেখেই অত্যন্ত হালকা করে বানানো হয়েছে এই হেলিকপ্টার। এর ওজন (ভর) মাত্র ১ কেজি ৮০০ গ্রাম। পৃথিবীর হেলিকপ্টারগুলোর মতো এরও রয়েছে দুটি রোটার বা পাখা। এই পাখাগুলো ঘুরবে মিনিটে ৩ হাজার বার, একে অপরের বিপরীত দিকে। পৃথিবীর হেলিকপ্টারের রোটারগুলো মিনিটে মাত্র ৩০০ বারের মতো ঘুরতে পারে।
পৃথিবীর কপ্টারগুলো সর্বোচ্চ ৪০ হাজার ফুট পর্যন্ত আকাশে উড়তে পারে। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল যতটা বৈরী হেলিকপ্টার চালানোর জন্য, তার চেয়ে বড় সমস্যা হলো পাইলট। ২০২০ সালে তো আর মানুষ যাচ্ছে না মঙ্গল অভিযানে, যাবে শুধু মহাকাশযান আর এই মার্সকপ্টার। তাহলে হেলিকপ্টার চালাবে কে?
চালাবেন নাসার বিজ্ঞানীরা, কোনো পাইলট নন। নাসার গবেষণাগার থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হবে কপ্টারটিকে, যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় মহাকাশযানগুলোকে। পৃথিবী থেকে মঙ্গলের গড় দূরত্ব ২৫ কোটি কিলোমিটার। অর্থাৎ মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে প্রায় ১৪ মিনিট। এ কারণেই পৃথিবী থেকে মঙ্গলে উড়তে থাকা হেলিকপ্টারকে তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নিয়ন্ত্রণ সিগন্যাল পাঠানো হবে আলোর গতিতে। তাই কমান্ড পৌঁছাতে সময় লাগবে ১৪ মিনিট। অর্থাৎ পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা সব সময় কপ্টারটির ১৪ মিনিট আগের অবস্থান জানতে পারবেন, তাৎক্ষণিক অবস্থান নয়। সুতরাং এত দূর থেকে কপ্টারটিকে নিয়ন্ত্রণ করাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো হাল ছাড়ার পাত্র নন। তাঁরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন এটা নিয়ন্ত্রণ করার, সেভাবেই এটাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
কিন্তু মঙ্গলে তো অরবিটার, রোভার পাঠানো হচ্ছে, তাহলে আবার হেলিকপ্টার কেন? রোভার ল্যান্ডারই বলুন আর অরবিটারই বলুন কোনো যানই মঙ্গলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার খবর দিতে পারেনি। মঙ্গলে চারপাশে ঘুরতে থাকা অরবিটারগুলো মঙ্গলের মাটির একেবারে ক্লোজআপ ছবি বা তথ্য দিতে পারে না। আবার রোভার ল্যান্ডারগুলো পৌঁছাতে পারে না পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে থাকা দুর্গম এলাকায়। এ জন্যই সেখানে হেলিকপ্টার পাঠানোর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মার্সকপ্টারই হতে যাচ্ছে মহাকাশে পাঠানো প্রথম হেলিকপ্টার। এটা যদি সফলভাবে মঙ্গলের আকাশে ওড়ানো যায়, সেটা হবে মহাকাশ গবেষণার এক নতুন ইতিহাস।
লেখক : সাংবাদিক, সূত্র : নিউ সায়েন্টিস্ট।

[ বিজ্ঞানচিন্তা, জুন, ২০১৮ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ১০ থেকে লেখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে। ]



আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা কানাডার একটি সম্পূর্ণ নদীকে দিনের ব্যবধানে বিলীন হয়ে যেতে দেখলেন।
এধরনের ঘটনাকে river piracy বা বাংলায় নদী দস্যুতা বলা যেতে পারে, যাতে একটি নদীর প্রবাহ অন্য নদী দখল করে নেয়। ঐতিহাসিক আলামত সাক্ষ্য দেয় এই প্রক্রিয়ায় একটি নদী বিলীন হয়ে যেতে হাজার হাজার বছর সময় লাগে, কিন্তু এই ক্ষেত্রে স্লিমস নামের নদীটি কেবল চার দিনের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে, যা গবেষকদের মতে ভূতাত্ত্বিক হিসেবে ‘তাৎক্ষণিক ঘটনা’। ভুতাত্ত্বিক অধিকাংশ ঘটনাই ঘটে লক্ষ বা কোটি বছর ধরে, নিদেন পক্ষে হাজার বছর সময় লাগে।
ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন টাকোমার গবেষক, ড্যান শুগার বলেন, “ভূতাত্ত্বিকগণ নদী দস্যতা পর্যবেক্ষণ করেছেন, কিন্তু আমাদের জানা মতে এখন পর্যন্ত আমাদের জীবদ্দশায় এটি কেউ প্রত্যক্ষ করেন নি।” তিনি বলেন, “মানুষ কোটি কোটি বছরের ভুতাত্ত্বিক রেকর্ড থেকে এধরনের ঘটনা অনুধাবন করেছেন কিন্তু আমাদের নাকের ডগায় মূহুর্তের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটবে তা কেউ আশা করে নি।”
ইউকনে প্রবাহিত স্লিমনদীর ধারে শুগার এবং তাঁর সহগবেষকবৃন্দ গিয়েছিলেন অন্য গবেষণার জন্য। কিন্তু সেখানে যখন পৌঁছালেন তখন দেখলেন গড়ে আধকিলোমিটার প্রশস্ত নদীর পানি স্রেফ উধাও হয়ে গেছে। তার বদলে পানির একটি সুক্ষ রেখা প্রবাহিত হয়ে দেখা গেছে।
নদীর পানি কোথায় গেলো তা খুঁজে দেখতে গবেষক দলটি ড্রোন এবং হেলিকপ্টার দিয়ে জরিপ করে দেখে এবং লক্ষ্য করে অন্য একটি নদীর দস্যতায় বিলীন হয়ে গেছে এই নদীটি।
গত ৩০০-৩৫০ বছর ধরে স্লিমস নদী, কাস্কাউলশ নামক একটি হিমবাহের বরফগলা পানির মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে আসছিলো। কিন্তু ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণতায় অধিকতর হারে বলফ গলতে থাকায় তার চাপে নতুন একটি নালার সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে পানির গতিপথ বদলে গিয়ে কাসকাউলশ নদীতে গিয়ে পড়ে।
এই ঘটনাটি কেবল এর দ্রুততার জন্যই অভিনব তা নয়, বরং গবেষকদের ধারণা, এটাই নদী পথের পরিবর্তনের প্রথম মানবসৃষ্ট কারণ।



ছোটবেলায় বাবা মায়ের কাছে আমাদের আবদারের শেষ ছিলো না, এটা চাই ওটা চাই লেগেই থাকতো। যদি আকাঙ্ক্ষিত বস্তু না পেতাম, শুরু করে দিতাম কান্নাকাটি। জন্মের পর থেকেই মানুষের সেই যে কাঁদার শুরু হয়েছে, সময়ের প্রয়োজনে বড় হওয়ার পরও বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন সময়ে এখনো মানুষ কাঁদে। আর যখন আমরা কাঁদি চোখ দিয়ে পানির স্রোত বয়ে যায়। কিন্তু আমরা কি জানি কেনো আবেগ, দুঃখ, হতাশা আর আনন্দে আমাদের চোখ দিয়ে পানি বের হয়? এর উৎস-ই বা কোথায়? চলুন জানা যাক।
কান্না একটি সহজাত ব্যাপার। গবেষণায় জানা যায় যে শুধুমাত্র মানুষ-ই নয়, প্রাণিজগতের আরো কয়েকটি সদস্যের কাঁদার ক্ষমতা আছে। তবে আবেগে কাঁদার বৈশিষ্ট্যটি মানুষের জন্য মৌলিক। মানুষ কেবল কষ্ট পেলেই কাঁদে না, সে আনন্দে কাঁদতে পারে, হতাশায় কাঁদতে পারে। আমরা কেনো কাঁদি গবেষকরা এখনো তার সঠিক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেন নি। তবে কিছু তত্ত্বগত ব্যাখ্যা অবশ্য আছে। কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন যে মানুষ তার শারীরিক ও মানসিক ব্যাথা প্রকাশের জন্য কাঁদে। তবে পিটাসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টরেট লরেন বিলস্মা (Lauren Bylsma) বলেন, “মানুষ নিজের আবেগময় মুহূর্তে পাশের মানুষটির সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে কাঁদে।” যেমন বাচ্চারা মায়ের মনোযোগের উদ্দেশ্যে কাঁদে।
অশ্রু সাধারণত অক্ষিগোলকের বাইরের উপরের অংশে অবস্থিত ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি (Lacrimal Gland) থেকে উৎপন্ন হয়। গুয়েলফ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মার্ক ফেন্সকে (Mark Fenske) বলেন যে মস্তিষ্কের আবেগপ্রবণ অঞ্চল, হাইপোথ্যালামাস (Hypothalamus) ও ব্যাসাল গ্যাংগিলার (Basal Gangila) সাথে ব্রেইন্সটেম-এর (Brainstem) ল্যাক্রিমাল নিউক্লিয়াস যুক্ত। যখন আবেগ (যেমন ব্যাথা বা আনন্দ) অনুভূত হয় তখন ল্যাক্রিমাল অশ্রু উৎপাদন করে।
উল্লেখ্য ল্যাক্রিমাল কেবল আবেগের ফলেই অশ্রু উৎপাদন করে না। ল্যাক্রিমালকে আমরা একপ্রকার স্বয়ংক্রিয় পানি উৎপাদন ও সরবরাহকারী হিসেবে গণ্য করতে পারি। কারণ, প্রতি সেকেণ্ডেই ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি থেকে অশ্রু উৎপাদিত হয় যা প্রোটিনসমৃদ্ধ ও ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী (Antibacterial)। উৎপাদিত অশ্রু অক্ষিগোলক ও অক্ষিপটের মাঝে পিচ্ছিল স্তরের সৃষ্টি করে ফলে আমরা পলক ফেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। মাইকেল ট্রিম্বেল (Michael Trimble) বলেন , “অশ্রু অক্ষিগোলককে আর্দ্র রাখতে প্রয়োজনীয়। এটি প্রোটিনযুক্ত এবং চোখকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় উপাদান ধারণ করে এবং সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।”
ল্যাক্রিমালে যখন অতিরিক্ত অশ্রু উৎপাদিত হয় তখন এই অতিরিক্ত অংশ নাসারন্ধ্রের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে বাস্তবে ‘চোখের জল নাকের জল’ এক হয়ে যাওয়া ব্যাপারটা সত্য। তাদের উৎপত্তিস্থল এক, কেবল পথ আলাদা। নাকের ভেতর দিয়ে পানি প্রবাহের এই ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা নাকের জন্যে ভালো বলে মনে করেন। তবে অতিরিক্ত কান্নার ফলে মাথাব্যাথা হতে পারে। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কোনো কোনো গবেষক মনে করেন যে অতিরিক্ত অশ্রু উৎপাদনের ফলে ল্যাক্রিমালে পানিশুন্যতা (Dehydration) হয়ে থাকে যার ফলে মাথাব্যাথা হয়। আবার অনেকে মনে করেন যে অতিরিক্ত কান্নার ফলে পেশীগুলো কিছুসময়ের জন্য দৃঢ় হয়ে যায় এবং মাথাব্যাথা অনুভূত হয়।
জৈবরাসায়নিকভাবে অশ্রুর উপাদান প্রধানত তিনটি; প্রোটিন, লবণ এবং কয়েক প্রকার হরমোন, যা আমাদের লালা (Saliva)-র সদৃশ। চোখের পানিকে সাধারণ দৃষ্টিতে পার্থক্য করা না গেলেও কাজের ধরণ অনুযায়ী এটি তিন প্রকারঃ
(১) মৌলিক অশ্রু (Basal Tear) : ল্যাক্রিমাল থেকে এর উৎপাদন বিরতিহীনভাবে চলে। এটি অক্ষিগোলককে পিচ্ছিল করে, পুষ্টি যোগায় এবং রক্ষা করে।
(২) প্রতিরোধী অশ্রু (Reflex Tear) : বহিরাগত বস্তু যেমন বাতাস, ধোঁয়া, ধূলাবালি অথবা তীব্র আলো চোখে প্রবেশের ফলে এই প্রকার অশ্রু উৎপন্ন হয় এবং চোখকে রক্ষা করে।
(৩) আবেগময় অশ্রু (Emotional Tear) : আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের উদ্দেশ্যে এই প্রকার অশ্রুর উৎপত্তি হয় এবং চোখের বাইরে ঝরতে থাকে।
তিনধরণের অশ্রুই একই উৎস থেকে উৎপন্ন হলেও তাদের রাসায়নিক উপাদানের অনুপাতে তারতম্য দেখা যায়। যেমন, আবেগময় অশ্রুতে প্রোটিনের মাত্রা বেশি থাকে। এছাড়া এতে লিউসিন (Leucine) নামক প্রাকৃতিক ব্যাথানাশক, এনকেফ্যালিনও (Enkephalin) পাওয়া যায় এবং ধারণা করা হয় যে এই উপাদানগুলোর জন্যই কাঁদার পর মানসিকভাবে হালকা অনুভূত হয়।
একজন স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের ল্যাক্রিমাল গ্রন্থিতে গড়ে প্রতিদিন ১০ আউন্স এবং প্রতিবছর ৩০ গ্যালনের (১ গ্যালন = ৪.৪৫৩৪ লিটার) মত অশ্রু উৎপাদিত হয়। তবে লিঙ্গভেদে এর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। স্বাভাবিকভাবে একজন মহিলা একজন পুরুষের থেকে বেশি কাঁদে। গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী মহিলাদের কান্নার মাত্রা গড়ে প্রতিমাসে ৫.৩ গুণ এবং প্রত্যেকবারের গড় সময় ৬ মিনিট যেখানে পুরুষের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ গড়ে প্রতিমাসে ১.৪ গুণ এবং সর্বোচ্চ ২ মিনিট। মাইক্রোস্কোপের নিচে পুরুষের অশ্রুগ্রন্থির কোষকে মহিলাদের অশ্রুগ্রন্থির কোষের থেকে বড় দেখা যায়। যার ফলে মহিলাদের অশ্রু খুব দ্রুত তাদের গাল বেয়ে নেমে যায়, কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে জলের ধারা কিছুটা পাইপের আকার ধারণ করে ও ঝরে যেতে সময় বেশি নেয়।
বয়স বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে মানুষের শারীরিক অনেক পরিবর্তন হয়। ছোট থেকে বড় হওয়া, তারপর বার্ধক্য, চামড়ায় ভাঁজ, দূর্বলতা, চুলে পাক ধরা, চুল পড়ে যাওয়া সহ আরো অনেক পরিবর্তন। কিন্তু একমাত্র অক্ষিগোলকের আয়তন এবং চোখের পানি উৎপাদন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চলে।



রাহেলা তার জীবনে প্রথমবার মা হতে চলেছে। গ্রাম থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এক দিন আগে চলে এসেছে হাসপাতালে। কোনো জটিলতা ছাড়াই প্রথম সন্তানকে স্বাগত জানাতে চায় তারা। দীর্ঘ আট ঘণ্টা প্রসব যন্ত্রণার পর ছেলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো। কিন্তু জন্মের পরপরই শিশুটির ভয়ানক শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেলো। শীত মৌসুমে এরকমটা খুবই স্বাভাবিক। পরীক্ষা করে জরুরী ভিত্তিতে বাচ্চাকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করে দিলেন চিকিৎসক। এক দিন পর বাচ্চার অবস্থার আরো অবনতি হলো। শ্বাস নেবার সময় বুকের নীচের অংশ নীচের দিকে বসে যাচ্ছে।
অ্যান্টিবায়োটিক কালচার সেনসিটিভিটি টেস্ট করে দেখা গেল, Amoxicillin, Contrimoxazole, Nalidixic Acid, Gentamicin, Ceftazidime, Amikacin, Ciprofloxacine, Ceftriaxone, Cefotaxime, Cefuroxime, Aztreonam এবং Netilmicin গ্রুপের প্রতিটি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে তার শরীরে আক্রমণকারী জীবাণুটি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। অর্থাৎ কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই শিশুটির জন্য এখন আর কার্যকর নয়। একমাত্র Meropenem বাকি আছে। চিকিৎসক হতবাক। এই বাচ্চার যদি এখনই এই অবস্থা হয়, তাহলে তো অনেক সমস্যা দেখা দেবে। এবারের মতো সুস্থ করে তোলা যাবে হয়তো, কিন্তু দীর্ঘ জীবনের বাকি দিনগুলোতে নিশ্চয়তা দেবার মতো কিছুই আর বাকি রইল না।
কিন্তু কী এই অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স? এক কথায় জীবাণুগুলোর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে যাওয়াকেই বলে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স। একটি প্রজাতি ক্রমাগত একই ধরনের বিষাক্ত পর্দাথের সংস্পর্শে বহুদিন আসতে থাকলে ধীরে ধীরে সেই প্রজাতির বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত সেই পরিবর্তন। এই ধারাবাহিকতায় হঠাৎ করে এমন একটি পরিবর্তন চলে আসে যার ওপর সেই বিষাক্ত পদার্থ আর বিষাক্ত হিসেবে কাজ করবে না। এন্টিবায়োটিকও জীবাণুর জন্য একপ্রকার বিষাক্ত পদার্থ। প্রতিরোধের মাধ্যমে জীবাণুও হয়ে যেতে পারে এর প্রতি সহনশীল।
এধরনের প্রতিরোধী প্রজাতিকে বলা হয় সুপার বাগ। এরা কতটা ভয়ংকর, সেটা বুঝতে হলে ইতিহাসের দিকে একটু তাকাতে হবে। প্লেগ, কলেরা, যক্ষ্মায় একসময় লাখ লাখ মানুষ মারা যেত। ব্যাকটেরিয়াজনিত এসব রোগের কোনো ওষুধ ছিল না সে যুগে। এ অবস্থার পরিবর্তন আসে আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের পেনিসিলিন আবিষ্কারের পর।
মাত্র এক শতাব্দী আগের কথা। পেনিসিলিন আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা একের পর এক নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করলেন। তারই ফসল হচ্ছে আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞানের জয়যাত্রা। যক্ষ্মা, কলেরা এসব রোগকে এখন কেউ পাত্তাই দেয় না আর। সবাই জানে এসব রোগের চিকিৎসা আছে। অনেকের আবার ডাক্তারের পরামর্শও নেবার দরকার পড়ে না। জ্বর হলেই কোনো একটা অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন সুস্থ। তারপরও খারাপ লাগলে আর ২-১ ডোজ। এরপর শরীর একটু ভালো হয়ে গেলে আর ওষুধ খায় না। সাময়িক সুস্থ হয়ে খুশিমনে জীবনের গতিতে চলতে থাকে।
কিন্তু তাদের কারণে এমন এক সমস্যার সৃষ্টি হয়, যার মাশুল গুণতে হয় সকল মানুষকে। এমনকি যারা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেনি তারাও এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো কোর্স শেষ না করলে দেহের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পুরোপুরিভাবে ধ্বংস হয় না। মানুষটিকে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ বলে মনে হলেও, তার ভেতরে যে অল্প কিছু জীবাণু রয়ে গেছে, সেগুলো শিখে যায় কী ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক তার ক্ষতি করতে পারে। তারপর কয়েক প্রজন্মে তার জেনেটিক পরিবর্তন ঘটে এবং সেসব অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে টিকে থাকার উপায় বাতলে নেয়।
জীবাণুগুলো বংশপরম্পরায় এই বৈশিষ্ট্য রেখে যায়। এরা হয় অপ্রতিরোধ্য। এগুলোই সেই ‘সুপার বাগ’। পরবর্তীকালে একই অ্যান্টিবায়োটিক আর সেই সুপারবাগের ওপর কাজ করে না। আবার এই সুপারবাগ বায়ু, পানি, মাটি ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়ে অন্য কারো দেহে প্রবেশ করে। এতে দেখা যায়, নতুন পোষকের শরীরেও সেই অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না। তখন আরো শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয়। ভয়ংকর ব্যাপার। ভয়ংকরতার মাত্রা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে।
এটা অনেক বড় সমস্যা, কিন্তু তার চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে এসব জীবাণুর জন্য শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করা যায় না। ধীরে ধীরে অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার কমে আসতে আসতে এখন আশংকাজনক অবস্থানে পৌঁছেছে। ধারণা করা হচ্ছে, শিগগিরই এসব সুপারবাগের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো আর ওষুধ থাকবে না মানুষের হাতে। এখন পর্যন্ত পাঁচ প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক আমরা হরহামেশা ব্যবহার করছি। যেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর বিরুদ্ধে প্রায় সব ব্যাকটেরিয়া সম্পূর্ণ রেজিস্ট্যান্স হয়ে গেছে।
এ অবস্থা চলতে থাকলে শিগগিরই এমন এক অবস্থায় আমরা উপনীত হবো, যখন আর অ্যান্টিবায়োটিক কাজই করবে না। আবার আমরা সেই পুরোনো দিনে ফিরে যাবো, যখন কলেরায় গ্রামের পর গ্রাম ব্যাপী মানুষ মারা যেত।
ফিরে আসি সেই শিশুটির কথায়। শিশুটিকে তার শরীরে কাজ করবে এমন একমাত্র অ্যান্টিবায়োটিক Meropenem দিয়ে ভালো করে তোলা হলো সে বারের মতো। কিন্তু সে কি জীবনে আর কখনো সুপারবাগ ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে অসুস্থ হবে না? তখন কী অ্যান্টিবায়োটিক দেবে? এজন্য দরকার সচেতনতা। ভুলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করবেন না। অবশ্যই একবার শুরু করলে এর সম্পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করবেন। উন্নত দেশে এখন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপসন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রিই আইনত দণ্ডনীয়। সচেতনতা না বাড়ালে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের মানুষই হবেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ।



একটা কৃত্রিম উপগ্ৰহ মূলত তিনটি কাজ করে থাকে। পৃথিবীর গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে তারা সিগন্যাল বা সংকেত গ্ৰহণ করে। সেই সংকেতকে প্রসেস বা বিশ্লেষণ করে এবং তারপর ঐ সিগন্যালকে আবার গ্ৰাউন্ড স্টেশনে ফেরত পাঠায়।
অনেকগুলো ইলেকট্রনিক সিস্টেমের সাহায্যে একটা কৃত্রিম উপগ্ৰহ এই কাজটা করে থাকে, যা চাঁদ বা প্রাকৃতিক উপগ্ৰহ দিয়ে সম্ভব নয়। তাছাড়া প্রাকৃতিক উপগ্রহ বা চাঁদ কখনই একই স্থানে থাকে না, স্থান পরিবর্তন করে।
কিন্তু কৃত্রিম উপগ্রহগুলি জিও-স্টেশনারী বা ভূসমলয় কক্ষে থাকার ফলে ঐ সমস্যা নেই। আর একটা কারণ হলো চাঁদ পৃথিবী থেকে অনেকটা দূরে থাকার দরুণ সিগন্যাল আসা-যাওয়া করতে ১/৪ সেকেন্ডের বেশি সময় লাগে।



যে কোনও বস্তুই ঠাণ্ডা বা গরম লাগে, কারণ সেই বস্তুতে আমাদের হাতের উত্তাপ চলে যায় বা বস্তুর উত্তাপ আমাদের হাতে চলে আসে। যে কোনও ধাতব বস্তু হলো তাপের সুপরিবাহী। তাই ধাতব বস্তু স্পর্শ করলে হাত থেকে তাপ চট করে চলে যাবে তাতে। মনে হয় যেন ঠাণ্ডা লাগল। কাঠ তাপের কুপরিবাহী। তাই হাতের মাধ্যমে উত্তাপ যাবার সম্ভাবনা নেই। সেইজন্য কাঠের বস্তু স্পর্শ করলে গরমই লাগে।



জনপ্রিয় বিষয়সমূহ

ফলিত বিজ্ঞান · পদার্থ · রসায়ন · জ্যোতির্বিদ্যা · বিজ্ঞানী · জ্যামিতি · বীজগণিত · গণিতবিদ
পরিবহন · যন্ত্র · প্রকৌশল · টেলিযোগাযোগ · কম্পিউটারইলেকট্রনিক্স · ন্যানোপ্রযুক্তি · কৃষি · মহাকাশ · সামরিক প্রযুক্তি
মানবদেহ · রোগব্যাধি · মনোবিজ্ঞান · পুষ্টি · জিনতত্ত্ব · চিকিৎসা · জরুরী চিকিৎসা

জীববিজ্ঞান · জীবাণু · উদ্ভিদ · অমেরুদণ্ডী · মাছ · উভচর · সরীসৃপ · পাখি · স্তন্যপায়ী

ভূতত্ত্ব · রাষ্ট্রসমূহ · মানচিত্র · শহর · সাগরমহাসাগর · পাহাড়-পর্বত · নদ-নদী · দ্বীপ · আবহাওয়াজলবায়ু · অভিযান
সমাজ · সংস্কৃতি · সমাজবিজ্ঞান · নৃবিজ্ঞান · রাষ্ট্রবিজ্ঞান · সরকার · আইন · রাজনীতি · বিচার · শিক্ষা · সামরিক বাহিনী
অর্থনীতি · শিল্প · ব্যবসা · ব্যাংক

ধর্মীয় দর্শন · আস্তিক্যবাদ · নাস্তিক্যবাদ · ইসলাম · হিন্দুধর্ম · বৌদ্ধধর্ম · খ্রিস্টধর্ম · ধর্মগ্রন্থ

ভাষাবিজ্ঞান · ভাষা পরিবার · প্রাচীন ভাষা · বিলুপ্ত ভাষা · ব্যাকরণ · লিখন · কবিতা · উপন্যাস · কল্পসাহিত্য · বাংলা সাহিত্য
স্থাপত্য · ভাস্কর্য · সঙ্গীত · নৃত্য · চিত্রশিল্প · আলোকচিত্র · চলচ্চিত্র · স্থাপত্য
ক্রীড়া প্রতিযোগিতা · ক্রিকেট · ফুটবল · বিনোদন · বাংলাদেশের গ্রামীণ খেলাধুলা

বর্ষপঞ্জি · ইতিহাস · সভ্যতা · প্রাচীন সভ্যতা · প্রত্নতত্ত্ব · যুদ্ধ · সমসাময়িক ঘটনা

পেশা অনুযায়ী নারী · নারী সহিংসতা · বিজ্ঞানী · দার্শনিক · নারীস্বাস্থ্য · নোবেলজয়ী
সাহিত্যিক · বিজ্ঞানী · গণিতবিদ · শিল্পী · অভিনয়শিল্পী · রাজনীতিবিদ · খেলোয়াড়
পশ্চিমবঙ্গ (সরকার · ইতিহাস · জেলা · ব্যক্তিত্ব · ভূগোল · শিক্ষা প্রতিষ্ঠান · সংস্কৃতি · কলকাতা) · ত্রিপুরা · অসম

সরকার · ইতিহাস · প্রশাসনিক অঞ্চল · সামরিক বাহিনী · বাংলাদেশি · ভূগোল · শিক্ষা · সংস্কৃতি · ঢাকা · চট্টগ্রাম